সোমবার, ২রা মার্চ, ২০১৫ ইং | ১৮ই ফাল্গুন, ১৪২১ বঙ্গাব্দ (বসন্তকাল) | ১০ই জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৬ হিজরী

Home - ব্লগ - উপজেলাকে কার্যকর করা সম্ভব নয় যেসব কারণে

উপজেলাকে কার্যকর করা সম্ভব নয় যেসব কারণে

মোশাররফ হোসেন মুসা
বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকারের ভিত্তিমুলে চারটি ইউনিট (ইধংরপ টহরঃ) রয়েছে, সেগুলো হলো- ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড। দেশের জনগণও চারটি ইউনিটের যে কোন একটিতে বসবাস করছে। কিন্তু নির্বাচিত/অনির্বাচিত সরকারগুলো এই চারটি ইউনিটকে কার্যকর না করে তাদের কেন্দ্রীয় শাসনের প্রয়োজনে কখনও এগুলোর নীচে আরেকটি ইউনিট (যা স্বনির্ভর গ্রাম সরকার, গ্রাম সরকার, পল্লী পরিষদ ও গ্রাম সভা নামে পরিচিত) এবং উপরে মধ্যবর্তী ইউনিট (যা মহকুমা ও উপজেলা নামে পরিচিত) সৃষ্টি করে এগুলোকে দূর্বল থেকে দূর্বলতর করেছে। বৃটিশরা তাদের শাসনের প্রয়োজনে (উন্নয়নের স্বার্থে নয়) এদেশে বহুস্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার সৃষ্টি করে। প্রথমে তারা অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে জেলাতে ‘জেলা বোর্ড’ এবং সর্বনি¤œ পর্যায়ে ইউনিয়নে ‘চৌকিদার পঞ্চায়েত’ গঠন করে। পরবর্তীতে মধ্যবর্তী স্তর হিসেবে মহকুমা সৃষ্টি করে। তবে জেলা ও ইউনিয়নকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও মহকুমাকে সেভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। এরশাদ সরকার মহকুমাগুলোকে জেলায় রূপান্তরিত করে ‘উপজেলা পরিষদ’ নামে নতুনভাবে আবারও মধ্যবর্তী স্তর সৃষ্টি করেন। তবে কোন স্থানীয় কাজগুলো উপজেলা করবে সেগুলো বিবেচনায় না নিয়ে উপজেলা সৃষ্টি করায় দীর্ঘ ৩১ বছরেও এটিকে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সবকিছু জানা থাকার পরেও বর্তমান সরকার আবারও উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন করেছে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রয়োজনে, স্থানীয় সরকারের প্রয়োজনে নয়।

১৯৮২ সালে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। তিনি ক্ষমতা দখল করেই ঘোষণা দেন-রাজনীতি থেকে দুর্নীতেকে নির্মূল করা হবে। কিন্তু মাথায় থাকে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার চিন্তা। সেসময় কতিপয় জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিক ও সুবিধাবাদী আমলার পরামর্শে ‘উপজেলা পরিষদ’ নামে একটি বাহুল্যস্তর সৃষ্টি করেন। সে সময় ‘উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন পুনর্গঠন’ নামে এক অধ্যাদেশ জারী করে ‘হস্তান্তরিত কাজ’ ও ‘সংরক্ষিত কাজ’ নামে দুই প্রকারের কাজ সৃষ্টি করা হয়। হস্তান্তরিত কাজগুলো হলো- কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও সেচের ব্যবস্থা; প্রাথমিক শিক্ষা; স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা; পানীয় জলের ব্যবস্থা করা; পল্লী পূর্ত কর্মসূচী; কাজের বিনিময় খাদ্য কর্মসূচি; ত্রাণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন; সমবায় ও সমবায় ভিত্তিক গ্রামীণ কর্মসূচি; পশু পালন; ও মৎস চাষ সম্প্রসারণ ইত্যাদি। সংরক্ষিত কাজ গুলো হলো- আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা; দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা; রাজস্ব প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ; প্রয়োজন দ্রব্যাদি সরবরাহ; বৃহৎ শিল্প; খনন ও খনিজ উন্নয়ন ইত্যাদি। হস্তান্তরিত কাজগুলো উপজেলা পরিষদের জন্য ও সংরক্ষিত কাজগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। উপজেলাতে সরাসরি ভোটে শুধু ১ জন উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ‘উপজেলা পরিষদ’ গঠন করা হয়। শুরুতে উপজেলাতে অবকাঠামো খাতে বিপুল অংকের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে উপজেলা কেন্দ্রিক একটি সরকার সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়। বলা যায়- এরশাদ সরকার দীর্ঘ ৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন শুধু উপজেলার বলেই। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে উপজেলা পরিষদ বিলুপ্ত করে ‘থানা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি’ গঠন করে। গত ১৯৯৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকার উপজেলা পরিষদ আইন পাশ করে এবং ১৯৯৯ সালে ফেব্র“য়ারী মাসে সেই আইন বলবৎ করে। কিন্তু উপজেলা পরিষদের নির্বাচন না দিয়ে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করে। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে উপজেলা আইন বাতিল না করলেও উপজেলা পরিষদ কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নেয় নি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে ‘স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) অধ্যাদেশ’ ২০০৮ জারী করে। উক্ত অধ্যাদেশে বলা হয়, ১ জন উপজেলা চেয়ারম্যানের পাশাপাশি ২ জন ভাইস চেয়ারম্যান (১ জন পুরুষ ও ১ জন নারী) নির্বাচিত হবেন। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসে উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের অধ্যাদেশটি সামান্য সংযোজন-বিয়োজন করে আইনি বৈধতা দেন। কিন্তু উপজেলা পরিষদের কাজ কি হবে, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ২ জন ভাইস চেয়ারম্যানদের কাজের বিভাজন কিভাবে হবে ইত্যাদি সম্পন্ন করতে না পারায় দীর্ঘ ৫ বছরেও উপজেলাকে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
আমরা জানি, গ্রামীণ স্থানীয় কাজ করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ও নগরীয় স্থানীয় কাজ করার জন্য পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলো রয়েছে। যেসব স্থানীয় কাজ (গ্রামীণ ও নগরীয়) এই স্তরগুলো একক ভাবে করতে পারবে না সেগুলো উপজেলা করতে পারে। কিন্তু হস্তান্তরিত কাজগুলো ইউনিয়ন ও পৌরসভাগুলো এককভাবে সম্পন্ন করতে পারে কি না, তা কখনই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। সেজন্য ইউনিয়নকে গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের সর্বনি¤œ এবং পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন উভয়কে নগরীয় স্থানীয় সরকারের সর্বনি¤œ ইউনিট (ইধংরপ টহরঃ) হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। অন্যদিকে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব আয় সৃষ্টি করার বহু খাত রয়েছে। কিন্তু উপজেলার নিজস্ব আয়ের খাত সৃষ্টি করতে হলে ইউনিয়ন ও পৌরসভার থেকে কাজ নিয়ে যেতে হবে। সেটি সম্ভব না হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে উপজেলাকে চলতে হয়। যার নিজস্ব আয়ে চলার ক্ষমতা নেই, সেটি স্থানীয় সরকার হয় কিভাবে ! আবার সেটি স্বায়ত্বশাসনের দাবীই করে কিভাবে ! তাছাড়া হস্তান্তরিত বিভাগগুলোর কর্মকর্তা/কর্মচারীরা স্থানীয় সরকারের কাজ করবেন সে শর্তে চাকুরীতে যোগদান করেননি (যেমনি ভাবে পৌরসভা, সিটিকর্পোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদের কর্মচারীরা করে থাকেন)। এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো স্থানীয় সরকারের সমন্বিত স্তর-বিন্যাস ছাড়া উপজেলাকে কার্যকর করা যাবে না।
এদেশের আয়তন, ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভৌগোলিক অবস্থা, জনসংখ্যা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে এদেশে মূলত দুই প্রকারের কাজ রয়েছে, তাহলো- স্থানীয় কাজ ও জাতীয় কাজ। সে কারণে দুই প্রকারের সরকার ব্যবস্থা তথা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও জাতীয় সরকার ব্যবস্থা থাকতে পারে। বর্তমান ব্যবস্থায় একটি মাত্র সরকার থাকায় স্থানীয় সরকারগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বহিী বিভাগের বর্ধিত অংশ হয়ে কাজ করছে। সে জন্য আমাদের প্রস্তাব হলো, কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য পররাষ্ট্র, মুদ্রা, বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহ জাতীয় কাজগুলো নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। অবশিষ্ট সকল স্থানীয় কাজ স্থানীয় সরকারগুলোর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। জেলা হবে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট। জেলা একহাতে গ্রামীণ ইউনিট (ইউনিয়ন ও উপজেলা) এবং অন্যহাতে নগরীয় ইউনিটগুলো (পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন) নিয়ন্ত্রণ করবে। এ প্রস্তাবে উপজেলার আয়তনের মধ্যে পৌরসভা থাকবে না। ইউনিয়ন যে কাজগুলো করতে পারবে না মধ্যবর্তী স্তর হিসেবে উপজেলা সে কাজগুলো সম্পন্ন করবে। তখনও প্রশ্ন উঠবে, নগরীয় কাজগুলো যদি পৌরসভা/সিটিকরপোরেশন একক ভাবে করতে পারে, তাহলে গ্রামীন কাজগুলো করার জন্য একাধিক স্তরের কেন প্রয়োজন পড়বে! স্থানীয় ইউনিটগুলো স্থানীয়দের দ্বারা পরিচালনার জন্য নয়া উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। “স্থানীয় সরকার” নামটি সকলের কাছে বহুল ব্যবহৃত ও প্রিয় হওয়ায় সকল ইউনিটের সঙ্গে ‘সরকার’ সংযুক্ত করে ইউনিট গুলোকে প্রজাতান্ত্রিক রূপ দেওয়া যেতে পারে (যেমন- ইউনিয়ন সরকার, উপজেলা সরকার, জেলা সরকার, নগর সরকার ইত্যাদি)। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জেলার হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। বর্তমান ব্যবস্থায় জেলার হাতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় তো বহু পরের কথা প্রাইমারি স্কুলগুলোর নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা জেলা রাখে না। যদিও উন্নত বিশ্বে নগর সরকারের নিয়ন্ত্রণে বহু বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সেজন্য জেলাতে জনবল ও অর্থবল বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিয়ে ‘জেলা সরকার পদ্ধতি’ বাস্তবায়ন করতে হবে। সংক্ষেপে জেলা সরকারের রূপরেখা তুলে ধরা হলো। জেলা প্রশাসন, জেলা সংসদ ও জেলা আদালত মিলে ‘জেলা সরকার’ গঠিত হবে (জেলা সরকারের বাইরে জেলা ন্যায় পাল ও জেলা নির্বাচনিক বোর্ড থাকবে)। একই নিয়মে ইউনিয়ন সরকার, উপজেলা সরকার (যদি এটি প্রয়োজনীয় হয়) ও নগর সরকার গঠিত হবে। এই প্রস্তাবে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা/কর্মচারীরা স্থানীয় সরকারের অধীনে চাকুরী করবেন না। তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ দেখভাল ও স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য নিয়োজিত থাকবেন। স্থানীয় সরকারের জন্য আলাদা কর্মকর্তা/কর্মচারী ও প্রয়োজনে আলাদা ক্যাডার সার্ভিস সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখা দরকার, অতীত ও বর্তমানের রাজনৈতিক সংকট গুলো সৃষ্টি হয়েছে শুধুমাত্র স্বাধীন দেশের উপযোগী ‘গণতান্ত্রিক সরকার কাঠামো’ না থাকার কারণে। আরও মনে রাখা জরুরী, আমাদের দেশের শাসন কাঠামো কেমন হবে তা আমাদের দেশের ইতিহাস- ঐতিহ্য, ধর্ম, আয়তন, জনসংখ্যা ইত্যাদির দিকে দৃষ্টি রেখেই সেটি নির্ধারণ করতে হবে।

লেখক : গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য

Leave a Reply